দূরন্ত বিডি ডটকম -----------স্বাগতম ২০২৫------------মানবতার কথা বলে ---------- durontobd.com--------ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই, “জুলাই” মনে রেখে ভোটের নিশ্চয়তা চাই, অর্থনৈতিক মুক্তি চাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর-আখাউড়া সড়ক: মৃত্যুকূপে লাখো মানুষের দুর্ভোগ, কবে মিলবে সমাধান? - durontobd

সংবাদ শিরোনাম

.jpg

Thursday, 28 August 2025

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর-আখাউড়া সড়ক: মৃত্যুকূপে লাখো মানুষের দুর্ভোগ, কবে মিলবে সমাধান?


জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা থেকে আখাউড়া পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়কটি এখন একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। এই সড়ক, যা বিজয়নগর, আখাউড়া, এবং কসবা উপজেলার লাখো মানুষের জীবনযাত্রার প্রধান সংযোগসূত্র, এখন খানাখন্দ, ভাঙা সেতু, আর জলজমার কারণে একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি গর্তে লুকিয়ে আছে দুর্ঘটনার আতঙ্ক, আর প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে। বর্ষার সময় বৃষ্টির পানিতে গর্তগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়, ফলে ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেল, এমনকি পথচারীরাও আটকে পড়ে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়।


এই সড়কটি বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ, আখাউড়া ল্যান্ড পোর্ট, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, দাউদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আওলিয়া বাজার, চম্পকনগর, এবং সিঙ্গারবিল বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। কিন্তু এর বেহাল অবস্থার কারণে একটি ১৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে এখন আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। আমতলী বাজার থেকে সিঙ্গারবিল পর্যন্ত সড়কের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল কাদির বলেন, “এটি সড়ক নয়, মৃত্যুর মঞ্চ। প্রতিদিন দুর্ঘটনার ভয়ে গাড়ি চালাতে হয়।” 


সিঙ্গারবিল বাজারের ব্যবসায়ী রিমন ভূঁইয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “গাড়িতে যাওয়া অসম্ভব, তাই হেঁটে যেতে হয়। এই সড়ক আমাদের জীবনের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।” সিএনজি চালক সোহাগ মিয়া জানান, “গর্তের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়, আর বৃষ্টি হলেই পথ চলা দুঃসাধ্য।” সড়কটির ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও প্রতিদিন ২০-৩০ টনের ভারী ট্রাক চলাচল করে, যা সড়কের পিচ ছিঁড়ে ফেলে এবং ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়। 


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিজয়নগর উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “ভারী যানবাহনের চাপে সড়ক ধরে রাখা কঠিন। তবে শীঘ্রই মেরামতের কাজ শুরু হবে।” কিন্তু এই আশ্বাস স্থানীয়দের কাছে শুধুই কথার ফানুস। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া ১৭ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার প্রকল্প এখনো অসমাপ্ত। এই সড়ক শুধু বিজয়নগরের তিন লাখ মানুষের জন্যই নয়, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা আখাউড়া ল্যান্ড পোর্টের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি করে। সিলেট থেকে আসা পাথরবাহী ট্রাকগুলো এই সড়ক ব্যবহার করে, যা এর ক্ষতি আরও ত্বরান্বিত করছে। 


২০২৫ সালের আগস্টে টানা বর্ষণে গর্তগুলো আরও গভীর হয়ে পানিতে তলিয়ে গেছে। যানবাহন আটকে পড়ছে, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। শিক্ষার্থী তানজিনা আক্তার বলেন, “গর্তগুলো এত বড় যে চলাচল করা যায় না। আমরা প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছি।” ভাড়াও বেড়েছে—চান্দুরা থেকে আখাউড়ার ভাড়া ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। 


সিঙ্গারবিলের ভাঙা, সংকীর্ণ সেতুটি আরেকটি মৃত্যুফাঁদ। এতটাই সরু যে দুটি গাড়ি একসঙ্গে পার হতে পারে না। ভাঙা রেলিং আর দুর্বল কাঠামো যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সিএনজি চালক জামির হোসেন বলেন, “সেতুটি আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সময় নষ্ট হয়, আয় কমে।” মাইক্রোবাস চালক শামীম মিয়া যোগ করেন, “এই সেতুর জন্য যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকি।” এলজিইডি জানিয়েছে, ৭.৫ মিটার প্রস্থের নতুন সেতুর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ এখনো শুরু হয়নি। 


এই সড়কের দুর্দশা অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। আখাউড়া ল্যান্ড পোর্ট দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাকে পণ্য রপ্তানি হয় ভারতের ত্রিপুরায়, কিন্তু সড়কের অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা সময় ও অর্থের ক্ষতির মুখে। কৃষকরা ফসল বাজারে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন, ফলে ক্ষতি বাড়ছে। ব্যবসায়ী হাসান মিয়া বলেন, “এই সড়ক আমাদের ব্যবসা ধ্বংস করছে। পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, খরচ বাড়ে।” 


সামাজিক উন্নয়নও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না, রোগীরা হাসপাতালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। গর্ভবতী মা’র স্বামী মো. আলী বলেন, “রাস্তার গর্তে গাড়ি আটকে যাওয়ায় আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে পারিনি। ডাক্তার ছাড়াই সন্তান জন্ম নিয়েছে, মা ও শিশু ঝুঁকিতে।” 


স্থানীয়রা বারবার স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, এবং এলজিইডির দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু সমাধানের কোনো পদক্ষেপ নেই। ২০১০ সালে পিচ ঢালাইয়ের পর থেকে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়কটি ধ্বংসের পথে। অটোরিকশা চালক মো. কামাল বলেন, “এটা সড়ক নয়, মৃত্যুকূপ। যাত্রী ও চালক—সবাই কষ্টে।” যাত্রী রুশেল মিয়া বলেন, “ভাঙা সেতু, ভাঙা সড়ক—চান্দুরা থেকে আখাউড়া যেতে জান কাবার হয়।” 


এই সড়কের দুর্দশা কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়, জাতীয় লজ্জার বিষয়। সরকারের উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতির মাঝে এই সড়কের মানুষের আর্তনাদ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের অবহেলা আর ঠিকাদারদের দায়িত্বহীনতায় সংস্কারের অর্থ বারবার ব্যয় হলেও ফল মিলছে না। স্থানীয়রা এখন দাবি করছেন, সড়কের পুনর্নির্মাণ ও নতুন সেতু নির্মাণ না হলে তারা আন্দোলনে নামবেন। কৃষক মো. রফিক বলেন, “আমরা আর অপেক্ষা করব না। এই সড়ক আমাদের জীবন রক্ষার প্রশ্ন।” 


সড়ক ও সেতু মেরামতের জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হলেও, বাস্তবায়নের সময় নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই সড়কের প্রতিটি গর্ত একেকটি প্রশ্ন—কেন এই অবহেলা? কেন এই দুর্ভোগ? এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা, ও স্বপ্নের উপর নির্মম আঘাত অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের কাছে এখন সময় জবাবদিহিতার, এই মৃত্যুফাঁদ থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার।