দূরন্ত বিডি ডটকম -----------স্বাগতম ২০২৫------------মানবতার কথা বলে ---------- durontobd.com--------ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই, “জুলাই” মনে রেখে ভোটের নিশ্চয়তা চাই, অর্থনৈতিক মুক্তি চাই। দুই শিক্ষক নিয়ে টেনেটুনে চলছে কালিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিয়মিত না আসা শিক্ষক নিয়ে ক্ষিপ্ত অভিভাবকরা - Durontobd

সংবাদ শিরোনাম

.jpg

Thursday, October 16, 2025

দুই শিক্ষক নিয়ে টেনেটুনে চলছে কালিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিয়মিত না আসা শিক্ষক নিয়ে ক্ষিপ্ত অভিভাবকরা


জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের ১৫৫ নম্বর কালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংকট এখন এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যা শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতারই নয়, বরং ১৬০ জন শিশুর স্বপ্ন, তাদের কল্পনা, তাদের জীবনের সম্ভাবনা এবং প্রতিদিনের শেখার অধিকারকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।


 সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এত সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য কমপক্ষে পাঁচজন শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয়টি টিকে আছে মাত্র দুই শিক্ষকের কাঁধে, যার একজন প্রায় নিয়মিত অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত, ফলে স্কুলের ক্লাসগুলোতে শৃঙ্খলার বদলে নেমে এসেছে বিশৃঙ্খলা, বইয়ের পাতায় নেই জ্ঞানের আলো, কেবল ছড়িয়ে আছে হতাশা, অসহায়তা এবং ফিকে স্বপ্নের ছায়া। অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, কারণ তারা জানে প্রতিদিন তাদের সন্তানরা স্কুলে যায়, কিন্তু শিক্ষা পায় না, তাদের আগ্রহ নিভে যায় এবং তাদের মনে আত্মবিশ্বাসের আলো নিভে যায়। 


বিদ্যালয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে শিক্ষক ঘাটতি চলছিল, কিন্তু প্রশাসন একেবারেই উদাসীন, পদক্ষেপ শূন্য, দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যেন এই বাস্তবতা দেখতে অক্ষম। সম্প্রতি বদলি হয়ে আসা শিক্ষক ইমরান হোসেন ২৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যোগ দিলেও তিনি এখনও ক্লাসে উপস্থিত হননি, বরং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সহায়ক হিসেবে অফিসে ব্যস্ত, যা সরকারি বিধির সরাসরি লঙ্ঘন, নিয়মবিরুদ্ধ এবং শিশুর অধিকারকে অবহেলা। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মিন্টু মিয়া ও আরেকজন শিক্ষককে একাই পুরো বিদ্যালয় চালাতে হচ্ছে, আর প্রধান শিক্ষক যখন প্রশাসনিক কাজে অফিসে থাকেন, তখন একমাত্র শিক্ষককে তিনটি শ্রেণির ক্লাস একসঙ্গে নিতে হচ্ছে—যা এক কথায় মানবিক এবং শিক্ষাগত নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রূপ। 


এই বাস্তবতা শুধু কালিপুর বিদ্যালয়ের নয়, বরং সারা দেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিক্ষক শূন্যতার কারণে শিশুদের ভবিষ্যৎ দিনে দিনে নিঃশেষ হচ্ছে, তাদের চোখে স্বপ্ন শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বিদ্যালয় কেবল খালি বইয়ের পাতার সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিভাবকরা ক্ষোভভরে বলেন, “আমাদের সন্তানরা স্কুলে যায়, কিন্তু শিক্ষা পায় না, নতুন শিক্ষক যোগ দিলেও আসছেন না, এটা কী ধরনের অন্যায়?” অভিভাবক রহমতউল্লাহ আহমেদ আরও যোগ করেন, “আমাদের সন্তানের জীবন নিয়ে যেন কেউ ভাবছে না, দায়িত্বে যারা আছেন তারা নিশ্চুপ।” তাঁদের ক্ষোভ, হতাশা, চিৎকার কেবল স্থানীয় নয়, এটি এক সতর্কবার্তা প্রশাসন, সরকার এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি যে, শিশুদের সঙ্গে অবহেলা করা হচ্ছে এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত বিপন্ন হওয়ার পথে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিন্টু মিয়া স্বীকার করেন, “সংকট সত্যিই ভয়াবহ, একজন শিক্ষক অফিসে থাকায় সমস্ত চাপ আমাদের ওপর পড়ছে, আমরা উপজেলা শিক্ষা অফিসকে জানিয়েছি, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই।” অভিযুক্ত শিক্ষক ইমরান হোসেনও বলেন, “উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে অফিসে কাজ করছি, তবে জানি এটা নিয়মের বাইরে।” 


নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “অফিসে জনবল সংকট থাকায় তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু এই ‘দ্রুত ব্যবস্থা’ কথাটি যেন কাগজে লিখে রাখা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে বছরের পর বছর ধীরে ধীরে শিশুর শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘটনাই প্রশ্ন তোলে—কেন সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এত ধীর? 


কেন শিশুদের ভবিষ্যতকে আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের জালে আটকানো হচ্ছে? বর্তমানে দেশে প্রায় ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা, অথচ প্রাথমিক শিক্ষাই জাতির ভিত্তি এবং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নির্দেশ দিলেও মাঠ পর্যায়ে কোন পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। কালিপুর বিদ্যালয়ের শিশুরা প্রতিদিনই হারাচ্ছে শেখার আগ্রহ, তাদের চোখের স্বপ্ন শুকিয়ে যাচ্ছে, আর অভিভাবকরা দৃষ্টি ফেরাতে পারছেন না প্রশাসনের নীরবতার দিকে। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে কালিপুরের এই শিশুদের কান্না প্রমাণ করছে—সেই মেরুদণ্ড আজ ভেঙে যাচ্ছে অবহেলার ভারে, আর রাষ্ট্র কেবল নিঃশব্দ দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তার নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হতে। এই ঘটনার কড়া বাস্তবতা প্রশাসনকে ভাবাতে বাধ্য করুক যে, সময় এসেছে পদক্ষেপ নেওয়ার, নইলে আগামী প্রজন্মের চোখের স্বপ্ন, জাতির আশা এবং দেশের ভবিষ্যৎই হবে তাদের ব্যর্থতার প্রতীক।